Page Nav

HIDE

Breaking News:

latest

যুক্তিবাদী সমিতি তৈরির প্রেক্ষাপট - প্রবীর ঘোষ

প্রবীর ঘোষ, সভাপতি (ভাবিযুস) যুক্তিবাদী সমিতি গড়ে তোলার একটি প্রেক্ষাপট আছে। ১৯৮২ থেকেই যুক্তিবাদী সমিতির প্রস্তুতি শুরু। সেই প্রস্তুতি শুর...



প্রবীর ঘোষ, সভাপতি (ভাবিযুস)
যুক্তিবাদী সমিতি গড়ে তোলার একটি প্রেক্ষাপট আছে। ১৯৮২ থেকেই যুক্তিবাদী সমিতির প্রস্তুতি শুরু। সেই প্রস্তুতি শুরুর একটা কারণ আছে। নকশাল আমলে তাত্ত্বিক ক্লাস করাবার জন্য আমাকে ঘুরতে হয়েছিল দেওঘর, গিরিডি, দুমকা, কৃষ্ণনগর, গোপীবল্লভপুর, ডেবরা ইত্যাদি বহু জায়গায়।
সময়টা বড়ই খারাপ ছিল বিপ্লবীদের কাছে। পুলিশের চোখে ধুলো দিতে বিয়েটাও সেরে ফেললাম ২৩ বছর বয়সে। প্রতিটা স্টাডি ক্লাসে আমার পাসপোর্ট হিসাবে নিয়ে যেতাম আমার বউকে। কিন্তু একসময় আমার মনে হল, শুধু ব্যক্তিহত্যা চালিয়ে সাম্য আনা যাবে না। গড়তে গেলে ভাঙতে হবে স্বীকার করি। কিন্তু গড়ার কোন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা না থাকলে কোনদিনই সাম্যের সমাজ গড়ে উঠবে না। তৈরি হবে একটা ‘হুলিগান’ পার্টি।
তখন কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউসে আড্ডা দিতে আসতেন অনেক তরুণ-তরুণী। নকশাল নেতানেত্রী। ওদের তখন ক্যাডারের চেয়ে লিডার বেশি। নিজেদের মধ্যে চলত প্রবল দলাদলি। চারু মজুমদার, কানু সান্যাল, জঙ্গল সাঁওতাল, সৌরেন বসু এঁদের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে কথা বলে মনে হয়েছে—এঁরা সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে আদৌ গুরুত্ব দিতে রাজি নন। এই অবস্থায় আমার দল ছাড়া মানে ব্যক্তিহত্যার শিকার হওয়া। এটা অনুধাবন করেই কয়েক বছরের জন্য আন্দোলন থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিলাম।
সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ার ভাবনা থেকেই যুক্তিবাদী আন্দোলন গড়ে তোলা। উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষকে কুসংস্কার মুক্ত করা এবং তারপর ধীরে ধীরে স্বয়ম্ভর গ্রাম গড়ার দিকে হাত দেওয়া।
মাও-সে তুং-এর একটা কথায় বিশ্বাস রেখেছিলাম—‘বিপ্লবের আগে, বিপ্লবের সময়, বিপ্লবের পরে, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কোনও বিকল্প নেই। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ‘পরিবর্তন’ পত্রিকায় লেখা শুরু করলাম ১৯৮২ সাল থেকে।
লেখায় হাত দেওয়ার পিছনে কয়েকটি কারণ ছিল। এভাবে প্রবন্ধের একটা নতুন ঘরানা তৈরি করা, যাতে সাম্যে লড়াইয়ের সমস্ত মালমশলাই থাকবে আড়ালে। লেখা জনপ্রিয়তা পেলে সাংস্কৃতিক আন্দোলন এগিয়ে নেওয়া যাবে।
সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলাম, এদেশের অসাম্যের জগদ্দল ব্যবস্থাকে বাস্তবিকই পাল্টাতে হলে সমাজের কিছু মানুষের আন্তরিক সমর্থনের প্রয়োজন। আইন করে আজও জ্যোতিষচর্চা, ধর্মের নামে পশু বলি, দেহব্যবসা, পণপ্রথা ইত্যাদি বন্ধ করা যায়নি জন-সচেতনতার অভাবে। আবার আগে সমস্ত মানুষের বিবেকের পরিবর্তন ঘটাব, তারপর সমাজ বিপ্লব ঘটাবার কাজে হাত দেব এটাও অত্যন্ত ভুল ধারণা। হাতের সামনেই উদাহরণ রয়েছে। গত শতকের শেষভাগে রাশিয়ায় যখন প্রতিবিপ্লব ঘটল, মার্কসের মূর্তিকে উপড়ে ফেলল, তখন গোটা ‘অপারেশন’-এ কত মানুষ সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিল? অতি মুষ্টিমেয়। কোনও প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, গৃহযুদ্ধ ছাড়াই তারা হঠাৎ করে কমিউনিস্ট জমানা পাল্টে দিল। রাশিয়ার সামান্য কিছু মানুষ পুরো ‘অ্যাকশন’-এ নেতৃত্ব দিয়েছিল। নেতারা বুঝে নিয়েছিল, তাদের এই পাল্টে দেবার রাজনীতিকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা কেউ-ই প্রায় করবে না। কমিউনিস্টদের জোর করে চাপিয়ে দেওয়া ধারণা, মন্দির-মসজিদ গির্জায় জোর করে প্রার্থনা বন্ধ করে দেওয়া, উঁচু মহলে দুর্নীতি এসবই সাধারণ মানুষের কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছিল।
জনগণের মধ্যে এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ছিল। বার-ড্যান্স, ক্যাবারে, ব্লু-ফিল্ম, বেশ্যাবৃত্তি ইত্যাদি নানা ভোগসর্বস্বতা রুশ সমাজে ঢুকে গিয়েছিল। অলৌকিতার পক্ষে নানা গাল-গপ্পোকে ‘সত্যি বলে চালাতে চাইছিল রুশ সরকারি পত্র-পত্রিকা।কমিউনিস্টদের এই ‘ঘোমটার তলায় খেমটা নাচ’ দেশবাসীরা কী চোখে দেখছে, তা বোঝার সামান্যও চেষ্টা করেনি রাশিয়ার গদীতে বসা কমিউনিস্টরা। বুঝেছিল কমিউনিস্টদের ছুঁড়ে ফেলতে এগিয়ে আসা কিছু নেতা।
যেখানে শাসকদের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ আছে, কিন্তু প্রকাশ নেই, সেখানে মুষ্টিমেয় নেতাও সরকার উল্টে দিতে পারে, সমাজ পাল্টে দিতে পারে রাশিয়ার ইতিহাস তেমন-ই শিক্ষা দিয়েছে।
সমাজকে পাল্টে দেওয়ার পথ একটা নয়। বহু। প্রয়োজনে মানুষকে সচেতন করতে হয়। সমাবেশিত করে চালিত করতে হয়। কখনও বা ‘ডিস্কোর্স’ ঘটিয়ে মানুষের চিন্তাকে একমুখী করতে হয়। কখনওবা গণ-হিস্টিরিয়া তৈরি করে কার্যোদ্ধার করা হয়। শিক্ষা-সংস্কৃতিতে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে হিস্টিরিক করে তুলে 'ধর্মগুরু’ বা ধর্মযোদ্ধারা আত্মঘাতী বাহিনী তৈরি করে ফেলে। যেমনটা দেখছি ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বংসের সময়। আবার আদর্শের জন্য উচ্চমেধার মানুষদের আত্মবলি দিতে দেখেছি গত শতকে ছয়-সাতের দশকে নকশাল আন্দোলনে।
আবার, 'ডিসকোর্স’ ঘটিয়ে সিপিএমের দল কুশাসনের জগদ্দল পাথরকে উপড়ে ফেলতে দেখেছি। সমাজকে পাল্টাবার স্বপ্ন দেখা মানুষেরা তাদের সংগৃহীত জ্ঞান থেকে নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার ও প্রয়োগ করতে পারে। সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল কি বর্তমান সময়ে আদৌ সম্ভব? সংঘর্ষ বিনা কি সাম্যের সমাজ গড়া সম্ভব?সাম্যের শত্রুরা কি বিনা বাধায় কাজ করতে দেবে? সবগুলো প্রশ্নের উত্তর ‘না’।সাম্যের সমাজ গড়তে গেলে আক্রমণের মোকাবিলায় প্রতি আক্রমণ করতেই হবে। সংঘর্ষে যেতেই হবে। অসাম্য ভাঙতে সংঘর্ষ ও সাম্য আনতে নির্মাণ জরুরি। বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠী বা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীকে নিয়ে এক একটি পৃথক উন্নততর সাম্যের সমাজ গড়ার পরিকল্পনা নিলে তা হবে বাস্তবসম্মত। যেমন ওড়িয়াভাষী অঞ্চল বাংলাভাষী অঞ্চল (যার মধ্যে থাকবে পশ্চিমবাংলা, ঝাড়খন্ড, বিহারের বাংলাভাষী অঞ্চল, অসম ও ত্রিপুরার বাংলাভাষী অঞ্চল এবং বাংলাদেশ), ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী সংস্কৃতি প্রভাবিত অঞ্চল, বিহার, অন্ধ, ছত্তিশগড়, পূর্ব ভারতের সাতটি প্রদেশ—প্রত্যেকেই পৃথক দেশ হলে অসুবিধা কোথায়? কোথাও নেই। ইউরোপের ছোট ছোট দেশগুলো যদি স্বাধীন দেশ হয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে, তবে বাংলা, বিহার, ওড়িশা, অসম, ত্রিপুরা কেন পারবে না? নিশ্চয়ই পারবে। তাত্ত্বিক ভাবে পারবে। বাস্তবেও পারবে।
যাঁরা সাম্যের সমাজ গড়ায় নেতৃত্ব দেবেন, তাদের নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে। শোষিত জনগণের মধ্যে যদি কাজ করতে চান, তবে তাদের পাশে বন্ধুর মতো দাঁড়াতে হবে। পরিবারের একজন হতে হবে। তাদের ভালোবাসা, তাদের বিশ্বাস অর্জন করতে হবে। হতে হবে তাদের ভরসাস্থল। তবে না মানুষগুলো নেতার কথায় জীবন দিতে পারবে অবহেলে। এই নেতারা তো শূন্য থেকে হঠাৎ করে জন্মায় না। এরা একটু একটু করে হয়ে ওঠে। বরং বলা ভালো—একজন ভালো খেলোয়াড়কে গড়ে তোলার মতোই নেতা গড়ে তুলতে হয়। তারপর নানা ঘাত-প্রতিঘাত-লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে নেতা পরিশীলিত ও মার্জিত হয়। যুক্তিবাদী সমিতির অনেক রকম কুসংস্কার বিরোধী কাজের পাশাপাশি সাম্যের সমাজ গড়ার চিন্তাকে বাস্তব রূপ দেওয়ার বিষয়ে সমস্ত রকমের সহযোগিতা করাও কাজ।
এই আলোচনার মধ্য দিয়ে এটাই উঠে এল যে, যুক্তিবাদী সমিতি শুরুতে কয়েকটি লক্ষ্য স্থির করেছিল—
(এক) জনগণের একটা অংশকে কুসংস্কার থেকে মুক্ত করা। এবং সেইসঙ্গে বিভিন্ন অঞ্চলে কুসংস্কার বিরোধী অনুষ্ঠান করা, সেই অনুষ্ঠানে তথাকথিত নানা অলৌকিক ঘটনার পিছনে লৌকিক কৌশলকে বেআব্রু করা। কুসংস্কার বিরোধী ‘ওয়ার্কশপ’ করা। অর্থাৎ যারা কুসংস্কার বিরোধী অনুষ্ঠান করতে ইচ্ছুক, তাদের তৈরি করা। তথাকথিত অলৌকিক ক্ষমতার দাবিদারদের এবং জ্যোতিষীদের চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তাদের ভণ্ডামি ফাঁস করা, কুসংস্কার বিরোধী নাটক, পথসভা ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষের মধ্যে বিশ্বাস জাগিয়ে তোলা—ঐশ্বরিক শক্তি, ঈশ্বর, কর্মফল, ভাগ্য ইত্যাদির কোনও বাস্তব অস্তিত্ব নেই।
(দুই) শোষিত মানুষদের মধ্য থেকে এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো মানুষ গড়ে তুলতে সচেষ্ট হওয়া। সেই মানুষ যুক্তিবাদী সমিতির সভ্য হতে পারেন, আবার না-ও হতে পারেন। কিন্তু তাকে হতেই হবে সৎ, নির্লোভ, সাহসী, সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কিছু মানুষই শোষিত মানুষদের অধিকার বিষয়ে সচেতন করে বঞ্চনার ক্ষোভ জাগিয়ে তুলতে ও তাদের সমাবেশিত করতে পারেন। সেইসঙ্গে একথাও মনে রাখতে হবে সব্বাইকে সব কিছু বুঝিয়ে তারপর বিপ্লবের কাজে হাত দিতে গেলে আর বিপ্লব হবে না। কারণ সকলে কোনও দিনই একমত হবে না।
(তিন) সাম্যের সমাজ গড়তে গেলে এতদিনকার চিন্তা-ভাবনা-মূল্যবোধের সঙ্গে প্রতিনিয়ত সংঘর্ষ দেখা দেবে। সেই সংঘর্ষে লাঠি-বন্দুক না থাকলেও থাকবে পুরানো চিন্তার সঙ্গে নতুনের ঠোকাঠুকি। আপনার উন্নততর ধ্যান-ধারণা নিয়ে যখনই প্রচারে নামবেন, দলিতদের অধিকার সচেতন করতে নামবেন, তখনই হুজুরের দল ও তাদের সহযোগীরা আপনার বিরুদ্ধে সংঘর্ষে নামবে। তার মধ্যে থাকবে রাজনৈতিক দল, তাদের ‘বাহুবলী’রা, পুলিশ-প্রশাসন, প্রচার মাধ্যম ইত্যাদিদের কেউ কেউ। ওরা নেতৃত্বের চরিত্রহরণের চেষ্টা করবে, দলের কিছু নেতাকে কিনে নেবার চেষ্টা করবেই। অথবা সবাই একজোট হয়ে আপনার ও আপনার দলের বিরুদ্ধে নামতে পারে। কতটা লড়াইতে যাবেন, কতটা লড়াই এড়াবেন, কাদের সহযোগী হিসেবে পাবেন সেটা ভিন্নতর প্রশ্ন। দলিতদের ঘুম ভাঙাতে গেলে সংঘর্ষ অনিবার্য। সবাই যদি খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান-পানীয়-স্বাস্থ্য-শিক্ষার মতো সাংবিধানিক অধিকারগুলো দাবি করে বসে, তবে তো রাজনীতিকদের লুটে-পুটে খাওয়ার ঐতিহ্যকে লাটে তুলতে হয়।
(চার) সংঘর্ষের পর দ্বিতীয় ধাপে নির্মাণকালে শিক্ষা-সংস্কৃতি-আর্থিক উন্নতির মধ্য দিয়ে নতুন পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সংখ্যাগুরু জনগণকে নতুন নতুন ধ্যান-ধারণা ও মূল্যবোধের সঙ্গে পরিচয় করাতে হবে। সেগুলোকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হবে। ভিখারি ও নেশাড়ুদের নিয়ে আন্দোলন করা যায়নি, যাবেও না। সেজন্য গ্রামাঞ্চলের তাড়ির ঠেক ভাঙতে মহিলাদেরকেই উদ্যোগ নিতে হবে। আদিবাসীরা না খেলেও ভিক্ষে চায় না। তাই ওদের মধ্যে আত্মসম্মানবোধ তীব্র।
(পাঁচ) এই পর্যায়ের কাজ ঠিকমতো চালাতে পারলে পরের পর্যায়ে উন্নততর সাম্য গড়ার কাজে হাত দিতে হবে। এই নির্মাণ পর্যায়ে গড়ে তোলা হবে স্বনির্ভর গ্রাম, কমিউন, সমবায় ইত্যাদি! নিজেকে জিজ্ঞেস করে নিজের কাছে পরিষ্কার হতে হবে যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র এই পদ্ধতির প্রয়োগের সাহায্যে উন্নততর সাম্য আনা সম্ভব কি না? রাষ্ট্রশক্তি দখল করা সম্ভব কি না?
(ছয়) যারা দলিতদের সাম্য আনার কাজে ভবিষ্যতে নেতৃত্ব দেবে বলে মনে হয়, যুক্তিবাদী সমিতির তরফ থেকে তাদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনায় বারবার বসা দরকার। তাদের বোঝাতে হবে, আমাদের সমিতির প্রয়োগ কৌশল। এর জন্য প্রয়োজন ছিল শুরু থেকে আরম্ভ করার। কাঁচা মাটি নিয়ে গড়ার। সব খেলারই নিজস্ব কিছু নিয়ম বা কৌশল থাকে। কেউ-ই শুরুতেই আস্তিনের সেরা তাসগুলোকে ফেলে না। সেরা দল বা খেলুড়ে সে-ই, যে প্রয়োজন বুঝে তাস বের করে। শুরুতেই সব তাস ফেলিনি। শুরু করেছিলাম কুসংস্কারের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে। পরিবর্তন সাপ্তাহিকে আমার লেখা বছর তিনেক এমন একটা জনপ্রিয়তা পেল যে, শহর, মফঃস্বল, গ্রাম থেকে আমন্ত্রণ আসতে লাগল। ‘থ্রি মেনস আর্মি’ নিয়ে শুরু হলো কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা। আমি, আমার বউ সীমা ও শিশুপুত্র পিনাকী। প্রথমে সীমা গান ধরতেন। তারপর আমি আর পিনাকী নানা বাবাজি-মাতাজিদের অলৌকিক ক্ষমতার রহস্য ফাঁস করতাম। সেটা ১৯৮৫-৮৬ সাল। তারপর সংগ্রামের সাথী হলেন অরুণ মান্না, গুপি ও সঞ্জয়। কিছু কিছু সমমনোভাবাপন্ন মানুষের সঙ্গে মত বিনিময় শুরু করেছিলাম ১৯৮২-৮৩ সাল থেকেই। আচ্ছা, আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক সব-ই হতো।
একটা যুক্তিবাদী সংগঠন গড়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বারবার আলোচনায় উঠে আসত।১৯৮৫-র ১ মার্চ। বিকেলে আমার দেবীনিবাসের ছোট্ট ফ্ল্যাটে সমমনোভাবাপন্ন কিছু মানুষ এলেন। উদ্দেশ্য যুক্তিবাদী একটা সংগঠন গড়ার কাজকে রূপ দেওয়া। অসিত চক্রবর্তী, ডাঃ জ্ঞানব্রত শীল, ডাঃ সুখময় ভট্টাচার্য, অরুণ মান্না, গৌতম, সমরেন্দ্র, আদিত্য, জ্যোতি মুখার্জি এবং আরও কয়েকজন।
সেদিনই গড়ে উঠলো সংগঠন। নাম দেওয়া হলো ‘ভারতীয় যুক্তিবাদী সমিতি’। ১৯৮৯ সালে সমিতির নাম একটু পরিবর্তন ঘটিয়ে রেজিস্ট্রেশন হল ‘ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি যা যুক্তিবাদী সমিতি বা Rationalist Association নামে বেশি পরিচিত।
এভাবেই চলছে, চলবেও। আমজনতাকে বিজ্ঞানমনষ্ক, যুক্তিবাদী গড়ে তোলার এই অসম্ভব কঠিন লড়াইয়ে শুধু পাশে চাই সম মনোভাবাপন্ন বা মুক্তমনা বন্ধুদের।

No comments